কক্সবাজারে জুয়াবাজির ফাঁদে নিঃস্ব যুবসমাজ


শাহীন মাহমুদ, কক্সবাজার: কক্সবাজার জেলা শহর এবং উপজেলা গুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় মোবাইলে লুডু খেলা এখন জুয়ায় পরিণত হয়েছে। এক সময়ে যে লুডু বোর্ড ছিল কাগজের তৈরি, এখন তা মোবাইলে সফটওয়্যারের মাধ্যমে পাওয়া যায়। এছাড়াও গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বসছে জুয়া খেলার জমজমাট আসর। হাতের নাগালেই এসব আসর থাকায় জুয়ার নেশায় সেখানে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেছে এলাকার যুবসমাজ। অথচ প্রশাসন জুয়া বন্ধের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপই হচ্ছে বলে মনে করেছেন সচেতন মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্মার্টফোনে লুডু কিং নামে একটি সফটওয়্যার ইনস্টল করে সর্বোচ্চ আটজন মিলে এ খেলা খেলতে পারে। খেলার ধরন রয়েছে দুই প্রকার। একটি অনলাইনের মাধ্যমে অপরটি একটি মোবাইলে একইসঙ্গে বসে খেলা যায়। অনলাইন ছাড়া একসঙ্গে চারজনের খেলার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। চারজন মিলে খেললে এক একটি গেইম শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। প্রতি গেমে বাজি ধরা হয় ১০০-১০০০ টাকা। কোন কোন ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ আরো বেশিও হয়।

শুক্রবার (২১ আগষ্ট) রামু উপজেলা পরিষদের সামনে কথা হয় দ্বীপ ফঁতেখারকুল গ্রামের গৃহবধূ মুন্নি বেগম (২৬) সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার স্বামীর ২০ শতক জমি, দুটি গরু ছিলো। জুয়া খেলা খেলে তিনি (স্বামী) সব শেষ করেছে। জুয়া খেলতে নিষেধ করায় সে আমাকে অনেকবার মারধর করেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রামু উপজেলার সিকলঘাট, রাজারকুল, ফকিরাবাজার, মন্ডলপাড়া, অফিসেরচর, পঞ্জেখানা, গর্জনিয়া, কাউয়ারখোপ, সদরের খরুলিয়া বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে দিনে ও রাতে প্রকাশ্যে মোবাইলে লুডু ও তিন তাসের জুয়া খেলা চলে। মধ্য ও স্বল্প আয়ের পরিবারের লোকজন এসব আসরে আসেন। উপার্জনের যাবতীয় টাকা ছাড়াও অনেকেই সংসারের জিনিসপত্রও বন্ধক রাখেন বলে দাবী করেন একাধিব ভুক্তভোগী পরিবার।
খরুলিয়া নয়াপাড়া গ্রামের আনোয়ারা খাতুন (৩৩) বলেন, দুই বছর আগেও তাঁর সংসারে সুখ ছিল, ছিল শান্তি। স্বামী ছৈয়দর আলম পান ব্যবসা করতেন। ধীরে ধীরে জুয়ার নেশায় মত্ত হয়ে ছৈয়দর সে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। দিন-রাত পড়ে থাকতে শুরু করেন জুয়ার আসরে। সবার অগোচরে একদিন ব্যবহারিত মোবাইলটিও বিক্রি করে দেন। জুয়ার জন্য ঘরের খাটটিও বিক্রি করেন। এখন তিনি ঠিকমতো বাড়িতেই আসেন না। অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে এখন আনোয়ারাকে সংসার চালাতে হচ্ছে।

গর্জনিয়া এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, তিনি পেশায় একজন মোটরসাইকেল চালক ছিলেন। এক সময় নিয়মিত মোবাইল ফোনে লুডু কিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে জুয়া খেলতেন। খেলতে খেলতে এমন নেশা হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত আয়ের উৎস মোটরসাইকেলটিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে। এখন তিনি বেকার।
রামুর ইউপি সদস্য জাফর আলম ও হাবিব উল্লাহ কামাল জানান, এ পর্যন্ত দুই ইউনিয়নের শতাধিক মানুষ জুয়ার নেশায় নিঃস্ব হয়েছেন। তাঁদের বাধা দিলেও শোনেন না। উল্টো গালিগালাজ করেন।
রামু সরকারি কলেজের প্রভাষক ও মানবাধিকার কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এসব জুয়ারিরা যখন সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে, তখন তারা সামাজিক নানা প্রকার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই এ ধরনের জুয়া বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল বলেন, আমি নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জুয়া বন্ধে পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনেকবার বলেছি।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা বলেন, শিগগিরই জুয়ারিদের ধরতে ওইসব এলাকায় অভিযান চালানো হবে।