ভারসাম্য পররাষ্ট্রনীতিতে খালেদা জিয়ার অবদান
Date: 2026-02-04
ইতিহাস অনেক সময় কোনো নেতার গুরুত্ব নির্ধারণ করে তাঁর বিদায়ের মুহূর্তে। রাষ্ট্রের ভেতরের রাজনীতির চেয়েও তখন বড় হয়ে ওঠে তাঁর রেখে যাওয়া নীতি, অবস্থান ও উত্তরাধিকার। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঠিক এমনই এক মূল্যায়নের দ্বার খুলে দিয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের শোকবার্তা এবং জানাজায় ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশের সরকারি প্রতিনিধি, এমনকি কয়েকজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতি স্পষ্ট করেছে– খালেদা জিয়া কেবল ঘরোয়া রাজনীতির নেতা ছিলেন না; তিনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত এক রাষ্ট্রনায়কসুলভ ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও খালেদা জিয়া দুবার তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। এই দুই মেয়াদেই তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রনীতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্র, যার পররাষ্ট্রনীতি সব সময়ই কঠিন এক সমীকরণের ভেতর দিয়ে এগোয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব এবং বৈশ্বিক রাজনীতির চাপ– সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা করেই এখানে পথ চলতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর ছিল সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্য। তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে স্থায়ী বৈরিতা কোনো টেকসই কৌশল নয়; আবার অন্ধ আনুগত্যও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বরাবরই সংবেদনশীল।
খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল–ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে না আবেগের জায়গা থেকে দেখানো, না আবার একমুখী নির্ভরতার কাঠামোয় বন্দি করা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারত বিরোধিতাকে তিনি কখনও নীতিগত অবস্থান বানাননি, যদিও তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিসরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল। একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝেছিলেন, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে তাঁর সরকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে আলোচনা চালু রেখেছিল।
তবে এসব আলোচনায় অগ্রগতির পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি যে পুরোপুরি কাটেনি, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই দ্বৈত বাস্তবতা–আলোচনা চলা এবং সন্দেহ টিকে থাকা– খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতাকে একসঙ্গে তুলে ধরে।
এই সম্পর্কের কাঠামোকে আরও প্রভাবিত করেছিল খালেদা জিয়া সরকারের অর্থনীতি উদারীকরণ কর্মসূচি। নব্বইয়ের দশকের পর বিশ্বায়নের ধারায় যুক্ত হতে গিয়ে তাঁর সরকার বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগকে গুরুত্ব দেয়। এর ফলে ভারতের সঙ্গে কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক যোগাযোগও বাড়তে থাকে।
বাণিজ্যিক সম্পর্ক, ট্রানজিট আলোচনা ও আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সুযোগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে একটি নতুন প্রশ্নও সামনে আনে। সেটি হলো, অর্থনৈতিক সংযোগ কি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক নির্ভরতায় রূপ নিতে পারে? খালেদা জিয়ার সরকারের কৌশল ছিল এই সম্ভাবনা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এ কারণেই তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এটি ছিল শুধু আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার প্রশ্ন নয়, বরং একেবারেই বাস্তব প্রয়োজন থেকে উৎসারিত একটি সিদ্ধান্ত।
প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে কূটনৈতিক সমর্থন– এই চারটি ক্ষেত্রেই আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করছিল, অন্যদিকে কৌশলগত ভারসাম্যও রক্ষা করছিল।
খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল বহুমুখিতা–একাধিক দিক ও অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের সচেতন প্রয়াস। ‘লুক ইস্ট পলিসি’র মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিকে প্রসারিত করেন।
এই নীতির লক্ষ্য ছিল শুধু নতুন বাজার বা বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়; বরং বাংলাদেশের কৌশলগত পরিসর বিস্তৃত করা। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সড়ক, রেল, নৌ ও বন্দরভিত্তিক সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ট্রানজিট ও যোগাযোগ-কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তবে এই কানেক্টিভিটি নীতির ক্ষেত্রেও খালেদা জিয়ার সরকার একটি সূক্ষ্ম কৌশল অনুসরণ করেছিল; বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে। সংযোগ বাড়ানো হবে, কিন্তু তা যেন একতরফা নির্ভরতা তৈরি না করে; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে। এই ভারসাম্যের ধারণাই আসলে তাঁর পররাষ্ট্রনীতির গভীর দর্শন প্রকাশ করে।
খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির উত্তরাধিকার আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দি নয়; বরং তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সামনে একটি কঠিন পরীক্ষার মতো দাঁড়িয়ে আছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যদি এই ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী ও সার্বভৌমত্ব-নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির ধারা ধরে রাখতে পারেন, তবে বাংলাদেশ শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনই দেখবে না– দেখবে একটি পরিণত রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসী পুনর্গঠন।
ড. নার্গিস আক্তার বানু: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী

