আটকের ২৩ ঘণ্টা পর বঙ্গভবনের কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের কথা জানাল ডিবি
Date: 2026-02-05
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগে বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে আটক করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর এজিবি কলোনির বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে আটক করে। জব্দ করা হয়েছে তার মোবাইল ও ল্যাপটপ।
এদিকে আটকের প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর বুধবার রাত ১১টার দিকে মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে ছরওয়ারকে হাতিরঝিল থানার মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় ডিবি।
ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর এক্স আইডি হ্যাক সংক্রান্ত দলটির পক্ষ থেকে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ডিবির সাইবার ইউনিটের ওপর মামলাটির তদন্তভার বর্তায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে ছরওয়ার আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে হাতিরঝিল থানায় একটি নিয়মিত মামলার রুজু করা হয়েছে। ওই মামলায় হাতিরঝিল থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, আটক ব্যক্তির মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইস কর্মস্থল থেকে জব্দ করা হয়েছে। স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ডিবি পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহেতুক বিভ্রান্তি না ছাড়ানোর জন্য ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে পুলিশকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া মানা হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তার কর্তৃপক্ষ ও সচিবালয় থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় এর আগে হাতিরঝিল থানায় করা জিডির তদন্তে ছরওয়ারে আলমের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফরেনসিক রিপোর্ট না আসলে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।’ মামলা হলেই তাকে গ্রেপ্তার করা যায় কি–না এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট প্রমাণ আছে।’
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালত কর্তৃক গৃহীত হওয়ার আগে, গ্রেপ্তারের জন্য সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেওয়া প্রয়োজন। তবে দুর্নীতির মতো নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ বা আদালতের আদেশ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
জামায়াতের আমিরের ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনায় গত শনিবার রাতে হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। জিডিতে অভিযুক্ত হিসেবে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।
জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট নিয়ে পাল্টা–পাল্টি বক্তব্য আসছে। মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গভবনে গিয়ে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল। বঙ্গভবনে গিয়ে জামায়াতের প্রতিনিধি দলটি রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, জামায়াতের করা ডিজিটাল ফরেনসিকে দেখা গেছে, বঙ্গভবনের নামে একটি ই-মেইল থেকে ফিশিং মেইল পাঠানো হয়েছিল। যার মাধ্যমে ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় বা হ্যাক করা হয়। একটি সরকারি ই–মেইল ব্যবহার করে জামায়াত আমিরের ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে দেশের বাইরে থেকে এই হ্যাকিং করা হয়ে থাকতে পারে। তবে কে বা কোথা থেকে এটি করা হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
এরপর রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, জামায়াতের অভিযোগের ভিত্তিতে রাতে মতিঝিল এলাকা থেকে বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ারকে আটক করা হয়।
এদিকে বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে ধরতে মঙ্গলবার গভীর রাতে এজিবি কলোনীতে অভিযান চালায় ডিবি। এরপর ছরওয়াকে আটক করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয় আনা হয়।
শনিবার বিকেলে জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডেল থেকে ইংরেজিতে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টের একটি অংশে লেখা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যখন নারীদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। এটি অন্য কিছু নয়; বরং পতিতাবৃত্তির অন্য একটি রূপ।’
জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডেল থেকে দেওয়া পোস্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে এ পোস্ট নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। ছাত্রদল বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। নারীদের একটি দল এর প্রতিবাদে ঝাড়ু মিছিল করে। বিএনপিপন্থি অ্যাকটিভিস্ট ও ইনফ্লুয়েন্সাররা দাবি করেন, জামায়াতের আমির কর্মজীবী নারীদের চরম অবমাননা করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে জামায়াতের অফিশিয়াল ফেসবুক পোস্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, সাইবার হামলার মাধ্যমে জামায়াতের আমিরের নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। শুধু জামায়াতের আমির নন, আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে করেও জামায়াতের তরফে দাবি করা হয়, দলের প্রধানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছিল, যা কিছু সময় পরই উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ওই পোস্টের স্ক্রিনশট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরে শনিবার রাতেই হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। দলের প্রধান শফিকুরের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল ‘হ্যাক করে’ ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে সেখানে অভিযোগ করা হয়।

