নির্বাচনের আগেই চুক্তি করতে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে

Date: 2026-02-06
news-banner

সংসদ নির্বাচনের আগেই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে চুক্তি করতে সব প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় জিটুজি ভিত্তিতে এই চুক্তি হলেও প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না সরকার। তবে এ বিষয়ক একটি রিট খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য আগামী সোমবার দিন নির্ধারণ করেছেন আপিল বিভাগ। 

এর আগে কোনো চুক্তি না করতে নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব গত মঙ্গলবার এই আদেশ দেন। তবে আদালতের এমন নির্দেশনার পরও চুক্তির প্রক্রিয়া গোপনে চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে দাবি করছেন চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। 

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। শুরুর দিকে মিছিল-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল কর্মসূচি। বন্দরে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ছাড়াও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠন কর্মসূচি পালন করে। যুক্ত হয় শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদও (স্কপ)। তবে এনসিটি চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে যাওয়ার পরই কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দেয় বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। আন্দোলনকে বৃহত্তর রূপ দিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে কর্মসূচি ঘোষণা করে তারা। এরই অংশ হিসেবে এখন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চলছে। 

এই আন্দোলন ঠেকাতে বন্দরের ১৫ কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। তাদের ধারণা ছিল, এতে আন্দোলন স্থবির হয়ে যাবে। তবে গণবদলির পর আরও কঠোর কর্মসূচি দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। ভোটের আগ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ায় নেপথ্যে এটির বিরোধিতা করছে বিএনপি-জামায়াতও। তবে এ ব্যাপারে তারা আগের মতো এখন প্রকাশ্যে কিছু বলছে না।   

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং টার্মিনাল নির্মাণ ও আধুনিকায়নে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের প্রায় অর্ধেক এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন হয়। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। তারাও এটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। তাহলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার এত আগ্রহ কেন? কেন সরকার কোনো কিছু প্রকাশ করছে না? 

তিনি বলেন, যে বন্দরের ওপর দেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল, সেই বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল কেন নির্বাচনের দিন কয়েক বাকি থাকতে একটি অনির্বাচিত সরকার ইজারা দেবে? আমাদের এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর কেউ দেয়নি। তাই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গেছি আমরা। 

আরেক সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছর মেয়াদে ছেড়ে দেওয়া হবে। তাদের কাছে গেলে টার্মিনালের সব মাশুল কোম্পানিটিই আদায় করবে। তখন প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরকে কত ডলার পরিশোধ করবে, তা নিয়েই এতদিন দরকষাকষি চলেছে। এখন এটি কমিশন ভাগাভাগির চূড়ান্ত ধাপে আছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। অথচ এ-সংক্রান্ত একটি রিট মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আগামী সোমবার করবেন আপিল বিভাগ। আদালত এ সময়ের মধ্যে কোনো প্রক্রিয়া এগিয়ে না নিতে নির্দেশনা দিলেও তা মানছে না দেশে থাকা বিদেশিদের কিছু এজেন্ট। 

চট্টগ্রাম বন্দরে এখন চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু আছে। এগুলো হলো– নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) চিটাগাং, যা পতেঙ্গা টার্মিনাল নামে পরিচিত। এই চার টার্মিনালের মধ্যে পতেঙ্গা টার্মিনালে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গত বছরের জুনে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল বা আরএসজিটিআইকে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি তিনটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। এনসিটিতে দেশীয় অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত ৬ জুলাই। পরদিন থেকে ছয় মাসের জন্য নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে পরিচালনার দায়িত্ব দেয় বন্দর। এখনও তারা পরিচালনা করছে টার্মিনালটি। 

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াকে ঘিরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন গত বছর একটি রিট করেন। সেই রিটটিই আছে এখন আপিল বিভাগে। 

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের কেউ এই চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না। তবে এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে এসে নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, এনসিটিতে বিদেশি বিনিয়োগ হলে বন্দরের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা আসবে। এতে সক্ষমতা বাড়বে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগের দরকার। বিদেশি প্রতিষ্ঠান সেটাও করবে। এর মাধ্যমে বন্দরকে তারা আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করবে।  

ভোটের আগেই কেন চুক্তি করতে তড়িঘড়ি করা হচ্ছে– এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বন্দরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন, নির্বাচিত সরকার এলে চুক্তির প্রক্রিয়া থেমে যেতে পারে। সেই শঙ্কা থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানও চাচ্ছে ভোটের আগেই চুক্তি হোক।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News