প্রতিহিংসামুক্ত এক ভাষণ
Date: 2026-01-01
ইতিহাসে কিছু ভাষণ থাকে যা কেবল বক্তৃতা নয়– বরং তা হয়ে ওঠে সময়ের আত্মস্বীকার, জাতির সামনে উচ্চারিত নৈতিক দায়বদ্ধতার ঘোষণা। ১৯৬৩ সালের আগস্টে ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালের পাদদেশে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র যখন বলেছিলেন– ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’, তখন তিনি কোনো ক্ষমতার কর্মসূচি ঘোষণা করেননি; তিনি উচ্চারণ করেছিলেন নিপীড়িত মানুষের ভবিষ্যৎ-নৈতিকতার এক মহাকাব্য।
সেভাবেই দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ঢাকার পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে (৩০০ ফিট সড়কে) দাঁড়িয়ে তারেক রহমান যখন বললেন– ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, তখন সেটিও ক্ষমতার হুঙ্কার ছিল না, বরং তা ছিল ইতিহাসের সামনে এক পরিকল্পিত দায় স্বীকারের মুহূর্ত। স্বপ্ন মানুষকে পথ দেখায়, কিন্তু পরিকল্পনা মানুষকে পথ হাঁটায়। এই দিক থেকে দেখলে ‘ড্রিম’ ও ‘প্ল্যান’ পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং একই দার্শনিক ধারার দুই ধাপ। প্রথমটি নৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করে, দ্বিতীয়টি সেই দিগন্তে পৌঁছানোর সিঁড়ি নির্মাণ করে।
মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ছিল নৈতিক ভবিষ্যতের এক কাব্যিক ঘোষণা। তিনি জানতেন, যে সমাজ আইন দিয়েও বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে পারে, সেই সমাজকে বদলাতে হলে আগে নৈতিক চেতনাকে নাড়া দিতে হবে। তারেক রহমান সেই নৈতিক চেতনাকে সরাসরি ‘পরিকল্পনা’র কাঠামোয় রূপান্তর করতে চান। স্বপ্ন যেখানে মূল্যবোধ নির্ধারণ করে, পরিকল্পনা সেখানে পথনির্দেশ দেয়।
মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘ড্রিম’ যেমন ছিল ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ভবিষ্যৎ কল্পনা, তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’ তেমনি সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কাঠামোয় নামিয়ে আনার এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
নির্বাসনফেরত নেতাদের ভাষণে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রায়ই লক্ষ করা যায়। সেখানে প্রতিশোধের ভাষা থাকে না, থাকে না প্রতিপক্ষ-বিদ্বেষের তীক্ষ্ণ উচ্চারণ। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি প্যারিস থেকে নির্বাসন জীবন শেষ করে তেহরানে ফিরে যেমন বলেছিলেন, ‘আমি কারও ওপর প্রতিশোধ নিতে আসিনি’; নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের উদ্দেশে যেমন উচ্চারণ করেছিলেন ক্ষমা ও সহাবস্থানের বাণী; ইয়াসির আরাফাত নির্বাসনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রামাল্লায় ফিরে যেমন বলেছিলেন ‘আমরা ঘৃণা নয়, অধিকার চাই’; তারেক রহমানের ভাষণেও তেমনি লক্ষ করা যায় এক আশ্চর্য সংযম ও উদারতা।
এই ভাষণে কোথাও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি বিদ্বেষ নেই, প্রতিহিংসার আহ্বান নেই। বরং রয়েছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের কল্পনা। সেখানে পাহাড় ও সমতল, নারী ও পুরুষ, মুসলমান ও অমুসলমান– সবাই সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকারী।
ভ্লাদিমির লেনিন নির্বাসন থেকে ফিরে রাশিয়ার জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটিও ছিল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের একটি রূপরেখা। সেখানে তিনি বলেছিলেন, বিপ্লব মানে কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, সমাজের নৈতিক পুনর্গঠন। বেনজির ভুট্টো দীর্ঘ নির্বাসনের পর পাকিস্তানে ফিরে জনগণের উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানেও ছিল গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার। তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বক্তব্য এই ঐতিহাসিক ধারারই উত্তরাধিকার।
‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বক্তব্যটি আলাদা গুরুত্ব পায় এই কারণে যে, এটি কোনো ফাঁকা বুলিসর্বস্ব উচ্চারণ নয়। এর পেছনে রয়েছে ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা; যা এক অর্থে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার একটি খসড়া দলিল। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের অধিকার, যোগ্যতার ভিত্তিতে ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র– এসবই আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিক স্তম্ভ। এই পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের সম্পর্ক তাই অলংকারিক নয়, তা দার্শনিকভাবে সংগতিপূর্ণ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নির্বাসন থেকে ফিরে যে নেতারা প্রতিহিংসার পথ পরিহার করে পরিকল্পনা ও নৈতিকতার কথা বলেন, তারাই শেষ পর্যন্ত জাতির ভাগ্যরেখায় স্থায়ী ছাপ রেখে যান। তারেক রহমানের ভাষণ সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। এটি কোনো সমাপ্তি নয়; এটি একটি যাত্রার সূচনা– যেখানে স্বপ্ন নয়, পরিকল্পনা পথ দেখাবে। ক্ষমতা নয়, মানুষের অধিকার হবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
মেজর আবু জাফর তৌফিক আহমেদ (অব.): রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক